হাম ভাইরাস অত্যন্ত ছোঁয়াচে, কিন্তু সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যায় জটিলতা এড়ানো সম্ভব। লক্ষণ, ভুল ধারণা, ঘরোয়া করণীয় ও টিকা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য তথ্য।
ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন“আমার চেম্বারে যখন কোনো মা তার নিস্তেজ হয়ে পড়া শিশুকে নিয়ে দৌঁড়ে আসেন, তখন প্রায়ই দেখি একটা ভুল ধারণা বাচ্চার কষ্টটাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। হয়তো শুনেছেন — 'হাম হলে গোসল করালে ক্ষতি হবে', 'ঝাল খাবার একদম বন্ধ' কিংবা 'ঘর সারাদিন অন্ধকার করে রাখতে হবে'। আপনার দাদী-নানী বা প্রতিবেশীর মুখে শোনা এই কথাগুলো কি আসলেই সত্য, নাকি এই ভুলের কারণেই আপনার শিশুর অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠছে? আজ একজন ডাক্তার হিসেবে নয়, একজন অভিভাবক হিসেবে আপনার সাথে কথা বলব— যাতে সঠিক তথ্যের অভাবে কোনো শিশুকে আর ভুগতে না হয়।”
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ — এর নাম Measles Virus বা Rubeola। এটা এতটাই ছোঁয়াচে যে একজন আক্রান্ত শিশু কাশি বা হাঁচি দিলে আশেপাশের ৯০% অসুরক্ষিত শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটাকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করলে বিপদ। কারণ হাম থেকে হতে পারে — নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ (যা থেকে বধিরতা), ডায়রিয়া ও মারাত্মক পানিশূন্যতা, এবং বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের প্রদাহ বা Encephalitis।
গুরুত্বপূর্ণ: হাম শুধু ফুসকুড়ি নয়, এটি মারাত্মক জটিলতার নাম। সঠিক সময়ে পরিচর্যা ও টিকাই একমাত্র সুরক্ষা।
শুরু হয় জ্বর, সর্দি, শুকনো কাশি আর লাল চোখ দিয়ে। সাধারণত দ্বিতীয় দিনের দিকে মুখের ভেতরে গালের দিকে ছোট ছোট সাদা দানা দেখা যায় — যাকে বলা হয় Koplik's Spots। এটা দেখলে প্রায় নিশ্চিত বলা যায় হাম হয়েছে।
এরপর শুরু হয় র্যাশ। প্রথমে কানের পেছনে এবং কপালে, তারপর ধীরে ধীরে মুখ, ঘাড়, বুক, পেট হয়ে সারা শরীরে নামতে থাকে। এই সময় জ্বর সবচেয়ে বেশি থাকে — ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে।
ছোঁয়াচের সময়: শিশু শুধু র্যাশ বের হওয়ার পরই সংক্রামক নয়। র্যাশ বের হওয়ার ৪ দিন আগে থেকেই সে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে পারে, এবং র্যাশ বের হওয়ার পরেও কমপক্ষে ৪ দিন পর্যন্ত সংক্রামক থাকে। অর্থাৎ র্যাশ দেখার আগেই পরিবারের অন্য শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে — তাই সন্দেহ হলেই আইসোলেশন শুরু করুন, র্যাশের জন্য অপেক্ষা করবেন না।
সত্য: কুসুম গরম পানিতে গোসল করালে জ্বর কমে, শিশু আরাম পায়। ঠান্ডা পানি এড়িয়ে দ্রুত গোসল করিয়ে মুছে দিন। গোসল বন্ধ রাখলে ত্বকের সংক্রমণ বাড়তে পারে।
সত্য: হামের সময় চোখ আলোতে সংবেদনশীল হয় (Photophobia), তাই সরাসরি তীব্র আলো এড়ানো ভালো। তবে ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার রাখার দরকার নেই। বায়ু চলাচল ও স্বাভাবিক আলো রাখুন।
সত্য: হামের সময় পুষ্টির চাহিদা বেড়ে যায়। নরম, সহজপাচ্য খাবার দিন — ভাত, ডাল, স্যুপ, দই, কলা। বুকের দুধ খাওয়ালে আরও বেশি করে দিন। খাবার বন্ধ করবেন না, পুষ্টি নিশ্চিত করুন।
জ্বর ১০০.৪°F এর উপরে গেলে প্যারাসিটামল দিন। ডোজ: শিশুর ওজন অনুযায়ী প্রতি কেজিতে ১০-১৫ মিলিগ্রাম, প্রতি ৪-৬ ঘণ্টা পর পর। Aspirin কখনোই দেবেন না — এটি Reye's Syndrome ডেকে আনতে পারে। কপালে বা বগলে ভেজা কাপড় দিতে পারেন।
বারবার অল্প অল্প করে তরল দিন: বুকের দুধ, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, চালের মাড়, পাতলা স্যুপ। প্রস্রাব হলুদ বা কমে গেলে সতর্ক হন। বমি করলে প্রতি ৫ মিনিটে ১-২ চামচ করে দিন।
পরিষ্কার নরম কাপড় বা তুলো পানিতে ভিজিয়ে আলতো করে মুছুন। প্রতিবার নতুন তুলো ব্যবহার করুন, নাকের দিক থেকে বাইরের দিকে মুছুন। চোখের ড্রপ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দেবেন না।
র্যাশ বের হওয়ার ৪ দিন পর্যন্ত শিশু সংক্রামক। স্কুলে পাঠাবেন না, বাড়িতে নবজাতক ও টিকাবিহীন শিশুদের থেকে আলাদা রাখুন। হাত ধোয়ার অভ্যাস রাখুন।
বাংলাদেশসহ ভিটামিন এ-এর অভাবপূর্ণ দেশে হামের সময় ভিটামিন এ জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমায়। ডোজ বয়সভেদে আলাদা — তাই অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে দিন।
মনে রাখবেন: সন্দেহ হলে দেরি করবেন না। ডাক্তারের কাছে গিয়ে যদি সব ঠিক থাকে, সেটা স্বস্তির খবর। কিন্তু না গিয়ে বসে থাকলে পরিণতি মারাত্মক হতে পারে।
MR এবং MMR টিকা: বাংলাদেশের সরকারি টিকা কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী — ৯ মাস বয়সে MR টিকা এবং ১৫ মাস বয়সে MMR টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। টিকা নেওয়া শিশুর হাম হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯৭% কমে যায়।
আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে আসা অন্য শিশুদের কী করবেন: টিকা না নেওয়া থাকলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা দিলে সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে। ৬ মাসের নিচের শিশু বা গর্ভবতী মায়েদের দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
ভিটামিন A এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: নিয়মিত ভিটামিন A ক্যাপসুল (সরকারি ক্যাম্পেইনে বছরে দুবার) শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখে।
আপনার শিশুর টিকার কার্ড এখনই বের করুন — সব টিকা সময়মতো হয়েছে কি না যাচাই করুন।
আপনার শিশুর হাম হয়েছে? লক্ষণ নিয়ে দ্বিধায় আছেন? আমি ডা. রোমানুল ইসলাম, সরাসরি WhatsApp-এ মেসেজ করুন। শিশুর লক্ষণ বলুন, ছবি পাঠান, আমি দেখে পরামর্শ দেব। প্রাথমিক পরামর্শ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং চিকিৎসা শুরুর পর প্রথম ৩ দিন ফলো-আপও ফ্রি।
এখনই WhatsApp-এ পরামর্শ নিনযেকোনো সময় বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন
হাসপাতালের ঝামেলা ছাড়াই সেবা
মানসম্মত চিকিৎসা কম খরচে
অনলাইনে প্রেসক্রিপশন ও ফলোআপ
এই আর্টিকেলটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন। বিস্তারিত জানতে ডিসক্লেইমার দেখুন।